হকারমুক্ত রাজপথ গাড়ির দখলে

‘এক কান আমনেগো দিকে, আরেক কান ভ্রাম্যমাণ আদালতের দিকে। বেচমু কী, খালি দৌড়াদৌড়ির ওপর আছি। বেচাকেনাও নাই।’- চামড়ার জুতার নাড়াচাড়ার মাঝে মাঝে কথাগুলো বলছিলেন মধ্যবয়সী মোহাম্মদ আলী। মতিঝিলের আমেরিকান লাইফ ইন্সুরেন্স কার্যালয় সংলগ্ন সরষে ইলিশের সামনের ফুটপাতে গত ১৫ বছর ধরে ব্যবসা করছেন মোহাম্মদ আলী। কিন্তু গত ১২ নভেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়রের ফুটপাত দখলমুক্ত করার ঘোষণার পর থেকে তিনি চোর-পুলিশ খেলার মতো মালামাল নিয়ে ছোটাছুটিতে আছেন।

আক্ষেপ করে মোহাম্মদ আলী বলেন, আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাহলে অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং শুরু হলো কেন। নাকি বড়লোকের জন্য গরিব উচ্ছেদ কর্মসূচি চলছে? পাশেই ফুটপাতে বসা বেল্ট বিক্রেতা রহমান মিয়া বলেন, হকার উচ্ছেদ করা হচ্ছে রাস্তা-ফুটপাত দখলমুক্ত করার জন্য। কিন্তু গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে রাস্তা আরও বেশি দখল হয়েছে। তবে আমরা কী দোষ করলাম?

সোমবার দুপুর একটার দিকে মোহাম্মদ আলী আর রহমানের সঙ্গে কথা বলার মধ্যে মতিঝিলের রহমান চেম্বার ভবনের সামনের রাস্তায় তিন স্তরে গাড়ি পার্কিং করা হয়। এতে দুই-তৃতীয়াংশ দখল যায় মতিঝিল-টিকাটুলী সড়কের একপাশ। এসব গাড়ির মধ্যে ছিল রাস্তার উল্টো পাশের বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাড়িও। মেটলাইফ আলিকো ভবনের সামনে ছিল শখানেক মোটরসাইকেল। এভাবে পুরো মতিঝিলের সড়কের দিকে তাকালে হকারের বদলে এখন গাড়ির দীর্ঘ লাইনের দেখা মিলবে। অথচ ফুটপাত ও সড়ক অবমুক্ত করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী দক্ষিণের নগরপিতা।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, আমি যে অভিযান (হকার উচ্ছেদ) শুরু করেছি, তা শেষ করব। ফুটপাত ও সড়ক হকারমুক্ত হলে অবৈধ পার্কিংমুক্তও হবে। এটা সময়ের ব্যাপার। নগরবাসী বা পথচারীদের চলাচলের রাস্তা কেউ দখলে রাখতে পারবে না।

বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের বাসিন্দা, চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ীরা বলছেনÑ গত ডিসেম্বর থেকে মতিঝিল এলাকায় ধারাবাহিকভাবে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর পর ওই এলাকা প্রায় হকারমুক্ত হয়ে পড়ে। তবে অভিযানিক দলের খোঁজখবর রেখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু সংখ্যক হকার তাদের দোকান বসাচ্ছে। ডিএসসিসির গাড়ি দেখলেই বা খবর পেলে পণ্যসহ দ্রুত সটকে পড়েন হকাররা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কারণে ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোও ধীরে ধীরে কমে আসছে। অনেকে আবার বিকাল ৩টার পর পণ্য নিয়ে বসছেন। কিন্তু মতিঝিলের ফাঁকা সড়কগুলোয় সারি সারি গাড়ি পার্কিং করে রাখছেন ব্যবসায়ীরা কী চাকরিজীবীরা। এতে আগের মতোই চলাচলের প্রায় অযোগ্য ওই এলাকার সড়কগুলো। দিলকুশাসহ ভেতরের ক্লাব পাড়াগুলোর অবস্থা আরও করুণ।

গত দুদিন ধরে মতিঝিলের রাজউক অ্যাভিনিউর বিডিবিএল ভবন, বিআরটিসি ভবন, শিপিং করপোরেশন, জীবন বীমা ভবন, ক্লাবপাড়া, মতিঝিল-টিকাটুলী সড়ক, বক চত্বর এলাকায় রাস্তার দুপাশে অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের চিত্র চোখে পড়ে। জীবন বীমা ভবনের উল্টো দিকে মতিঝিল ট্রাফিক পুলিশ বক্স। তার পাশেই প্যাসিফিক হোটেল পর্যন্ত রিকশা স্ট্যান্ড এবং দীর্ঘ গাড়ি পার্কিংয়ের বহর। বক চত্বর থেকে বিসিআইসি ভবন হয়ে টিকাটুলী সড়কের দুধারে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় শত শত প্রাইভেটকার। এমনকি ওই সড়কের ৪৯-৫১ দিশকুশা, কৃষি ভবনের সামনে আইন তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে পার্কিংয়ে রাখা ছিল কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, সাধারণ বীমা ভবনের গাড়ি। ৫৩ দিলকুশা, মডার্ন ম্যানশনের সামনে রোববার অবৈধভাবে রাখা ছিল সরকারের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ‘আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন প্রকল্পের’ গাড়ি। মতিঝিল-নটরডেম কলেজ সড়কের রাস্তার একপাশের অর্ধেক সড়ক সকাল-সন্ধ্যা দখলে থাকে ওই এলাকার সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে।

গাড়িচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মতিঝিল-দিলকুশা এলাকার পুরনো অধিকাংশ ভবনেই গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। গাড়ি পার্কিংয়ে সিটি করপোরেশনের ‘সিটি সেন্টার’ নির্মাণ করা হলেও সেখানে গাড়ি রাখার আগ্রহ কম। এতে যত্রতত্র গাড়ি রাখা হচ্ছে।

গুলিস্তানের স্টেডিয়াম মার্কেট, গোলাপশাহ মাজার এলাকায় হকারের উপদ্রব কমে এলেও আগের মতো অবরুদ্ধ গোলাপশাহ-বঙ্গবন্ধু পাতাল মার্কেট সংযোগ সড়ক। ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা, শার্ট, বেল্ট, জুতার, ব্রাশের দোকানে সারাক্ষণই সরগরম থাকে ওই সড়কটি।

মতিঝিল-গুলিস্তানের হকাররা জানান, ভ্রামামাণ আদালতের ভয়ে সারাক্ষণ চোর-পুলিশ খেলায় মত্ত থাকলেও বিভিন্ন সংগঠন, পুলিশের নামে তোলা চাঁদার হার কমেনি। একদিকে চাঁদা পরিশোধ, অন্যদিকে বেচাকেনা কম থাকায় তারা দুরাবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। গুলিস্তানের জাতীয় গ্রন্থ ভবনের সামনের ফুটপাতের এক ব্রাশ ব্যবসায়ী জানান, বিক্রি যাই হোক লাইনম্যানকে আগের মতো ৩০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিয়ে দোকান খোলা যায় না। চোর-পুলিশ খেলায় অনেক হকার দুর্ভোগে থাকলেও পেশা বদল করতে চাচ্ছে না।

মতিঝিলের ইস্পাহানি ভবনের সামনের ফুটপাতের জুতা বিক্রেতা শহীদুল ইসলাম বলেন, খারাপ সময় যাচ্ছে। আগে যা বিক্রি হতো এখন তার তিন ভাগের একভাগও বিক্রি হচ্ছে না। তবে কর্ম পাল্টানোর কথা ভাবছি না। সবকিছু সময়ের ব্যাপার। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। আশা করছি কদিন পর আবার আগের মতো ব্যবসা শুরু করতে পারব।

এদিকে হকার উচ্ছেদের সুযোগে গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্রের দেয়াল ঘেঁষে অবৈধভাবে মাইক্রোবাস ও সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড বসিয়েছে একটি রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্র। ঢাকা মহানগরী মাইক্রোবাস-কার মালিক সমিতির নামে ওই সারা দিন সেখানে লম্বা লাইনে রাখা হচ্ছে ২০-২৫টি মাইক্রোবাস-প্রাইভেট কার। তার পেছনে গোলাপশাহ মসজিদের দেয়াল ঘেঁষা সিএনজি অটোরিকশার লাইন। উচ্ছেদের আগে সেখানকার ফুটপাতে শাড়ি কাপড়ের দোকান ছিল। নগর ভবনের কমবেশি ১০০ গজ দূরত্বে ওই অবৈধ স্ট্যান্ডে পার্কিংরত সিএনজি অটোরিকশার এক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই স্ট্যান্ডে দাঁড়ালেই ১০ টাকা গুণতে হয়। চাঁদা নেন যুবলীগের কর্মীরা। এদিকে গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ও মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম অভ্যন্তর, ডাক ভবন-বায়তুল মোকাররম মার্কেটের মাঝের সড়কের পুরোটাও অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s